টেকনাফে এসএডিপি প্রকল্পের আওতায় স্কুল মাদ্রাসায় দেওয়া অনুদান

উপরমহলের নামে ঘুষ আদায়

প্রকাশ: অক্টোবর ৬, ২০২৩ ১১:১৬ am , আপডেট: অক্টোবর ৬, ২০২৩ ১১:২৬ am

পড়া যাবে: [rt_reading_time] মিনিটে


জসিম উদ্দিন :
কক্সবাজারের টেকনাফে এসএডিপি প্রকল্পের আওতায় স্কুল-মাদ্রাসায় দেওয়া অনুদানের টাকায় ভাগ বসালেন উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার নুরুল আবসার। উপরমহলে দেওয়ার নামে তিনি ১৫টি স্কুল-মাদ্রাসা থেকে ১০ লক্ষাধিক টাকা আদায় করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য সেকেন্ডারি এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের (এসইডিপি) আওতায় টেকনাফে প্রথম ধাপে নয়টি স্কুল ও ছয়টি মাদ্রাসাকে পাঁচ লাখ টাকা করে মোট ৭৫ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হয়। ওই টাকা থেকেই তিনি ভাগ বসালেন। ফলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অনুদানের অর্থ দিয়ে নির্দেশনা অনুযায়ী খাতের যথাযথভাবে উন্নয়ন করতে পারেননি বলে জানা গেছে। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানপ্রধানরা মুখ খুলতেও ভয় পাচ্ছেন। তাদের আশঙ্কা এতে তারা ওই সরকারি কর্মকর্তার হাতে নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে পারেন। অভিযোগ উঠেছে, বিতর্কিত এ উপজেলা সুপারভাইজার দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় ধরে টেকনাফে বহাল থেকে নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন।

অনুদানপ্রাপ্ত বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক-পরিচালনা কমিটির সদস্যরা একাডেমিক সুপারভাইজারের ঘুষ আদায়ের বিষয়টি স্বীকার করে জানান, উপরমহলে প্রদানের কথা বলে একাডেমিক সুপারভাইজার তাদের কাছ থেকে অনেকটা জোর করে এ অর্থ আদায় করেছেন। বিদ্যালয়ের স্বার্থে ভবিষ্যৎ হয়রানির ভয়ে তারা এ নিয়ে তেমন কোনো উচ্চবাচ্য করেননি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য সরকার সেকেন্ডারি এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (এসইডিপি) চালু করে। এর আওতায় পারফরম্যান্স বেজড গ্র্যান্টস ফর সেকেন্ডারি ইনস্টিটিউশনস স্কিমের আওতায় প্রথম ধাপে সম্প্রতি ১৫টি স্কুল-মাদ্রাসাকে পাঁচ লাখ টাকা করে এ অনুদান প্রদান করা হয়। অনুদানপ্রাপ্ত স্কুলগুলো থেকে ৫০ হাজার টাকা ও মাদ্রাসা থেকে এক লাখ টাকা করে আদায় করেন একাডেমিক সুপারভাইজার।

অনুদানের লক্ষ্য হচ্ছে মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি করা, মাধ্যমিক স্থরে শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ অংশগ্রহণ ও তাদের প্রতিষ্ঠানে ধরে রাখা, পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা এবং পরিচালনা পদ্ধতি শক্তিশালীকরণ। আর অনুদানের টাকা কোন খাতে কত পার্সেন্ট খরচ করতে হবে তাও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে প্রকল্প ম্যানুয়েলে। এতে শিক্ষক বৃদ্ধের জন্য প্রণোদনা ২০ ভাগ, বইপত্র-লাইব্রেরি, শিক্ষা উপকরণ এবং গবেষণাগার সরঞ্জাম ইত্যাদির উন্নয়নে ৩০ ভাগ, ছাত্রছাত্রী বিশেষ করে ছাত্রীদের জন্য স্কুল/কলেজ/মাদ্রাসা ফ্যাসিলিটির অবকাঠামো, বিশুদ্ধ পানি, শৌচাগার, কমনরুম ইত্যাদি উন্নয়নে ২৫ ভাগ, সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের সহায়তা ব্যয় ১৫ ভাগ এবং প্রতিবন্ধী/বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের ফ্যাসিলিটি উন্নয়নে ১০ ভাগ টাকা খরচের কথা বলা হয়েছে।

অনুদানপ্রাপ্ত বিদ্যালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, একাডেমিক সুপারভাইজার অনুদানের একটা অংশ নিয়ে নেওয়ায় তারা খাত অনুযায়ী বরাদ্দ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেননি।

টেকনাফের হোয়াইক্যং কাঞ্জরপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি বেলাল উদ্দিন জানান, চেকের মাধ্যমে অনুদানের অর্থ ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা করা হয়। এতে গাইডলাইন অনুযায়ী শিক্ষকরা প্রণোদনা বাবদ পান এক লাখ টাকা। একাডেমিক সুপারভাইজারকে এ এক লাখ থেকে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে দেন শিক্ষকরা। ফলে শিক্ষকরা তাদের প্রাপ্য টাকার চেয়ে কম টাকা পান।

নয়াপাড়া আলহাজ নবী হোসেন উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি আবুল কালাম জানান, অনুদানের অর্থ কোন কোন খাতে খরচ করতে হবে তা স্পষ্ট গাইডলাইন দেওয়া আছে। একাডেমিক সুপারভাইজারকে ওই টাকা দেওয়ার ফলে খাত অনুযায়ী প্রকল্পের কাজ সম্পাদন করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে জানান তিনি। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে এ টাকা না দেওয়ার জন্য কমিটির পক্ষ থেকে বলা হলেও ভবিষ্যতে নানা হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কার কথা বলেন প্রধান শিক্ষক। ফলে তারা অনেকটা নিরুপায় হয়ে টাকা দেন। তাছাড়া ওই কর্মকর্তা এক যুগের বেশি সময় টেকনাফে অবস্থান করার ফলে শিক্ষা খাত অনেকটা তার হাতে জিম্মি বলে মনে করেন তিনি। এ ধরনের কর্মকর্তার অপসারণের দাবি করেন তিনি।

বাহারছড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি সাইফুল্লাহ জানান, সবার কাছ থেকে টাকা আদায় করার ফলে তিনিও ৫০ হাজার টাকা দিয়েছেন অনুদানের টাকা থেকে। একই কথা বলেন বাহারছড়া দারুদ তাওহিদ তাহফিমুল কুরআন মাদ্রাসার সভাপতি মৌলানা আজিজ উদ্দিন।

সাবরাং উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মফিজ উদ দৌলা জানান, তিনি ৫০ হাজার টাকা দেননি, তবে হাজার পাঁচেক খরচের টাকা দিয়েছেন।

টেকনাফ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকেও ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করা হয়েছিল বলে জানান পরিচালনা কমিটির সভাপতি নুরুল বশর।

তিনি জানান, ঊধ্বর্তন কর্তৃপক্ষের দোহাই দিয়ে টেকনাফ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেছিলেন একাডেমিক সুপারভাইজার নুরুল আবসার। কিন্তু পরিচালনা কমিটি ঘুস প্রদান না করার সিদ্ধান্ত নেয়, ফলে পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ঘুসের এ টাকা প্রদান করা হয়নি। অনুদানের টাকা থেকে গ্রহণের বিষয়টি স্কুল-মাদ্রাসার প্রকল্পসংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও পরিচালনা কমিটির সবার মুখে মুখে আলোচিত হলেও হয়রানির ভয়ে কেউ এতদিন মুখ খুলতে সাহস পাননি বলেও জানান তিনি।

ঘুস আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন টেকনাফ উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার নুরুল আবসার। তিনি দাবি করেন, এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। প্রকল্পের সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা

আদনান চৌধুরীর কাছে একাডেমিক সুপারভাইজারের বিরুদ্ধে ঘুস গ্রহণের অভিযোগটি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, তিনি এ ব্যাপারে কিছু জানেন না, তিনি যোগদানের আগেই এ অর্থ ছাড় করা হয়েছে। তবে কেউ লিখিত অভিযোগ দিলে তদন্ত করে দেখা হবে, প্রয়োজনে গণশুনানি করে অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে বলে জানান তিনি।