মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী :

কক্সবাজারে শিশু আদালত পরিচালনার জন্য নতুন স্থায়ী এজলাস নির্মাণ করা হচ্ছে। আগামী জানুয়ারীর মধ্যে এজলাসের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হবে এবং ফেব্রুয়ারী থেকেই নতুন এজলাসে শিশু বান্ধব পরিবেশে বিচারকার্য পরিচালনা করা হবে।

আইন ও বিচার বিভাগের “স্ট্রেংদেনিং ক্যাপাসিটি অব জুডিসিয়াল সিস্টেম ফর চিল্ড্রেন প্রোটেকশন ইন বাংলাদেশ” প্রকল্পের আওতায় শিশু আদালতের পৃথক এই এজলাস নির্মাণ করা হচ্ছে। আইন ও বিচার বিভাগ সুত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সুত্র মতে, আইনের সাথে সাংঘাতে জড়িয়ে পড়া শিশুদের জন্য জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ ২০১৩ সালের শিশু আইন অনুযায়ী শিশুবান্ধব আদালত গড়ে তোলা সহ শিশুদের সামগ্রিক বিচার প্রক্রিয়ায় শিশু আইন কার্যকর করতে দেশের ২০টি জেলাকে পাইলট প্রকল্পের আওতায় এনেছে। তারমধ্যে, কক্সবাজার সহ দেশের ৯ টি জেলায় ইউনিসেফ বাংলাদেশ এর কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় শিশু আদালতের স্থায়ী এজলাস গড়ে তোলা হচ্ছে। কক্সবাজার সহ দেশের অন্যান্য জেলা গুলো হচ্ছে-জামালপুর, রাজশাহী, রংপুর, খুলনা, বরিশাল, বরগুনা, হবিগঞ্জ ও চট্টগ্রাম।

সুত্র মতে, ২০১৩ সালের শিশু আইন অনুযায়ী আইনের সাথে সাংঘাতে জড়িয়ে পড়া শিশুদের ভীতিহীন ও শিশু বান্ধব পরিবেশে বিচারকার্য পরিচালনা করতে সরকার এ উদ্যোগ নিয়েছে। এজলাস গুলোর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলে এগুলো হবে শিশু আইন অনুযায়ী নির্মিত দেশের প্রথম স্থায়ী শিশু আদালত।

নির্মাণাধীন শিশু আদালতের এজলাস লালসালু ঘেরা প্রচলিত বিচারিক এজলাস হবেনা। থাকবেনা আসামী ও সাক্ষীর কাঠগড়া। স্বাভাবিক এজলাসের মতো বিচারক বসবেন না। পুলিশ ও আইনজীবী সহ দাপ্তরিক ও পেশাগত ড্রেসে এজলাসে কেউ থাকবেননা। সাধারণ ডিম্বাকৃতির ডাইনিং টেবিলের মতো অনেকটা ঘরোয়া ও ভীতিহীন পরিবেশে বিচারক, আইনজীবী, পুলিশ, আইনের সাথে সাংঘাতে জড়িয়ে পড়া শিশু, মামলার সাক্ষী, শিশুর অভিভাবক, আদালতের স্টাফ সহ সংশ্লিষ্ট সকলে শিশু বান্ধব পরিবেশে উপস্থিত থেকে বিচারকার্য পরিচালনা, জবানবন্দি প্রদান ও গ্রহণ, প্রয়োজনীয় সহায়তা ও দায়িত্ব পালন করবেন।

কক্সবাজার জেলা জজ আদালত ভবনের তৃতীয় তলার দক্ষিণ-পূর্ব কর্ণারে শিশু আদালত এজলাসের অবকাঠামো নির্মাণের কাজ বর্তমানে পুরোদমে এগিয়ে চলছে। কক্সবাজার সহ সারাদেশের ৯টি জেলায় শিশু আদালত এজলাসের অবকাঠামো গড়ে তোলার কাজে নিয়োজিত নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘ফোর্থ ডাইমেনশন’ এর সহকারী প্রকৌশলী মোঃ ইসমাইল হোসাইন জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানের কার্যাদেশের মেয়াদ রয়েছে তিন মাস। ইউনিসেফ ও বিচার বিভাগের তদারকিতে ইতিমধ্যে কক্সবাজার সহ ৯ জেলায় অনুমোদিত ডিজাইন, প্ল্যান অনুযায়ী শিশু আদালতের এজলাস নির্মাণ কাজ প্রায় ৩০% সম্পন্ন হয়েছে। তিনি আরো জানান, ২০২৪ সালের জানুয়ারীর মধ্যেই ৯ টি জেলায় শিশু আদালত নির্মাণ কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন করা হবে। ফেব্রুয়ারীর শুরু থেকেই শিশু আদালতের নতুন স্থায়ী এজলাসে শিশু বান্ধব পরিবেশে আদালতের কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে।

কক্সবাজার সহ দেশের ৯ টি শিশু আদালত এজলাসের নকসা, ডিজাইন, প্ল্যান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘এ্যাকুম্যান আর্কিটেক্ট এন্ড প্ল্যানার্স লিমিটেড’ ৯টি জেলায় শিশু আদালতের এজলাস নির্মাণ কাজ মনিটরিং এবং সুপারভিশন করছে। ২০১৩ সালের শিশু আইন অনুযায়ী শিশু আদালতের এজলাস সংস্কার, সজ্জিতকরণ ও আভ্যন্তরীণ অবকাঠামো বিন্যাস করা হচ্ছে। ইউনিসেফ এর পাইলট প্রকল্পের অধীনে এজলাস গুলোর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলে কক্সবাজার সহ ৯ টি জেলায় হবে-শিশু আইন অনুযায়ী নির্মিত দেশের প্রথম শিশু বান্ধব পরিপূর্ণ স্থায়ী শিশু আদালতের এজলাস।

বর্তমানে দেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের এজলাস গুলোতে প্রচলিত স্বাভাবিক পরিবেশে শিশু আদালত পরিচালনা করা হয়। দেশের কোথাও কোথাও বিভিন্ন সময়ে শিশু আইন অনুযায়ী শিশু আদালতের এজলাস তৈরি করে শিশু আদালত পরিচালনা করা হলেও তা একেবারে সাময়িক ও অস্থায়ী।

সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারের তিনটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল প্রতি সপ্তাহে অন্তত একদিন করে নির্মাণাধীন শিশু আদালতের এজলাসে শুধুমাত্র শিশু মামলা গুলো পরিচালনা করার প্রাথমিক পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। নতুন এজলাসে শিশু আদালত যেদিন চলবে, সেদিন উক্ত আদালতে আর অন্য কোন মামলা পরিচালনা করা হবেনা।

কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের জেলা নাজির বেদারুল আলম জানান, শিশু আদালতের নতুন এজলাস নির্মাণে কক্সবাজার জজশীপ থেকে সম্ভব সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। নির্মাণাধীন শিশু আদালতের অবকাঠামো গড়ে তোলার কাজ শেষ হলে আনুষ্ঠানিকভাবে শিশু বিচারালয়টি উদ্বোধন করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে তিনি জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে, ইউনিসেফ এর পাইলট প্রকল্পের আওতায় কক্সবাজার সহ ৯টি জেলার বিচারক ও আইনজীবীদের ইতিমধ্যে ২দিন করে পৃথক পৃথকভাবে ২০১৩ সালের শিশু আইনের উপর গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। শিশু আদালতের সাথে জড়িত থাকা বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা, শিশু আদালতের স্পেশাল পিপি, সমাজসেবা বিভাগের প্রবেশন অফিসার, থানার শিশু বিষয়ক ডেস্কের কর্মকর্তা সহ সংশ্লিষ্ট সকলকে নিয়ে শিশু আইন পরিপূর্ণ কার্যকর করতে ইউনিসেফ এর উদ্যোগে মাল্টিসেক্টরাল ত্রৈমাসিক সমন্বয় সভাও নিয়মিত করা হচ্ছে। এছাড়া, কক্সবাজারে গত ৪ নভেম্বর অনুষ্ঠিত জেলা বিচার বিভাগীয় সম্মেলনেও ইউনিসেফ বাংলাদেশ বিভিন্ন সহায়তা করেছে বলে সুত্রটি জানিয়েছে।

শিশু বান্ধব পরিপূর্ণ শিশু আদালতের স্থায়ী এজলাস নির্মাণ প্রসংগে কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ তারেক বলেন, এ আদালতে সহজ ও সুন্দরভাবে ভীতিহীন পরিবেশে আইনের সাথে সাংঘাতে জড়িয়ে পড়া শিশুদের বিচারকার্য পরিচালনা করা যাবে। তিনি আরো বলেন, এতে দাগি অপরাধীদের সঙ্গে শিশুদের বিচারকাজ না হওয়ায় শিশুদের মনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। ফলে আগামী দিনের কান্ডারি শিশুরা ইতিবাচক ও গঠনমূলক চিন্তা করতে পারবে।

কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর স্পেশাল পিপি অ্যাডভোকেট সৈয়দ রেজাউর রহমান রেজা বলেন, শিশু বান্ধব পৃথক এজলাসে শিশুদের বিচারকার্য পরিচালনায় সরকার ও ইউনিসেফ বাংলাদেশ এর উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে পাইলট প্রকল্পের আওতাধীন ৯টি জেলায় সর্বপ্রথম শিশু বান্ধব স্থায়ী এজলাস নির্মিত হচ্ছে। তার মতে, পৃথক এজলাসে বিচারকাজ চললে ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন খুন, ধর্ষণ, অপহরণ সহ অন্যান্য মামলার আসামিদের সংস্পর্শে আসবেনা, আইনের সাথে সাংঘাতে জড়িয়ে পড়া শিশুরা। অ্যাডভোকেট সৈয়দ রেজাউর রহমান রেজা বলেন, আগে দেশে কোন কোন জেলায় বিচ্ছিন্নভাবে শিশু আদালত পরিচালনা করা হলেও সেটা অস্থায়ী এজলাসে সাময়িকভাবে করা হয়েছে।

কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট ইকবালুর রশিদ আমিন সোহেল বলেন, আইনসম্মতভাবে গড়ে তোলা শিশু আদালতে শিশু–কিশোরদের বিচার করা হলে ভবিষ্যতে নতুন করে অপরাধে না জড়াতে শিশুরা উদ্বুদ্ধ হবে। তিনি আরো বলেন, ধীরে ধীরে সব শিশু আদালতের এজলাস এভাবে গড়ে তোলা উচিত। এতে শিশুরা ভীতিহীন পরিবেশে আইন সম্পর্কে অবহিত হবে এবং দ্রুত সংশোধনের সুযোগ পাবে।

কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ তাওহীদুল আনোয়ার বলেন, শিশু আইনে শিশুদের বিচারকার্য পরিচালনায় আদালতের এজলাস কি ধরনের হওয়া উচিত, তার বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এতদিন কাগজেই সীমাবদ্ধ ছিল এ নিয়ম। ফলে বড়দের মতো শিশুদের বিচার হতো প্রচলিত আদালতে। অথচ শিশু যাতে বুঝে উঠতে নাপারে, তাকে আদালতে হাজির করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে বিচারকার্য চলছে-এরকম ভীতিহীন, শিশুবান্ধব এজলাসের কথা শিশু আইনে উল্লেখ রয়েছে। অ্যাডভোকেট তাওহীদুল আনোয়ার বলেন, কক্সবাজার সহ দেশের ৯টি জেলার মতো ক্রমান্বয়ে সব জেলাতে শিশু আদালতের পৃথক স্থায়ী এজলাস গড়ে তোলা দরকার।

কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর জ্যেষ্ঠ বেঞ্চ সহকারী মোহাম্মদ শামীম জানান, নির্মাণাধীন শিশু আদালতের নতুন এজলাসে শিশু মামলা গুলোর বিচার কার্যক্রম পরিচালনায় তারা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ট্রাইব্যুনালের বিজ্ঞ বিচারক ও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মতো এ বিষয়ে তাঁরা যাবতীয় কাজ গুছিয়ে নিচ্ছেন বলে তিনি জানিয়েছেন। যাতে, নতুন শিশু আদালতের নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর পরই সেখানে সাবলীল ও সুন্দরভাবে শিশু মামলা গুলোর বিচার কাজ নির্বিঘ্নে পরিচালনা করা যায়।

শিশু আদালত সম্পর্কে যা আছে শিশু আইনে :

২০১৩ সালে শিশু আইন প্রণয়ন করা হয়। ২০১৮ সালে আইনটির কয়েকটি ধারা সংশোধন করা হয়। সংশোধিত আইনে শিশুদের জন্য আলাদা আদালত বা পৃথক এজলাসের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।

২০১৩ সালের শিশু আইনের ১৭(৪) ধারায় বলা হয়েছে, যেসব দালান বা কামরায় এবং যেসব দিবস ও সময়ে প্রচলিত আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম চলে, তাছাড়া যতদূর সম্ভব, অন্য কোনো দালান বা কামরায়, প্রচলিত আদালতের মতো কাঠগড়া ও লালসালু ঘেরা আদালতকক্ষের পরিবর্তে একটি সাধারণ কক্ষে এবং অন্য কোনো দিবস ও সময়ে প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি ব্যতীত শুধু শিশুর ক্ষেত্রে শিশু-আদালতের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

একই আইনের ১৯ (২) ধারায় বলা হয়েছে, শিশু আদালতের আসন বিন্যাস এমনভাবে করতে হবে, যেন সব শিশু বিচার প্রক্রিয়ায় মাতা-পিতা বা তাদের উভয়ের অবর্তমানে তত্ত্বাবধানকারী অভিভাবক বা কর্তৃপক্ষ বা আইনানুগ বা বৈধ অভিভাবক বা বর্ধিত পরিবারের সদস্য এবং প্রবেশন কর্মকর্তা ও আইনজীবীর, যতদূর সম্ভব, সন্নিকটে বসতে পারে।

১৯(৩) ধারায় বলা হয়েছে, আদালতকক্ষে শিশুর জন্য উপযুক্ত আসনসহ প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য, প্রয়োজনে, বিশেষ ধরনের আসন প্রদানের বিষয়টি শিশু-আদালতের এজলাসে নিশ্চিত করতে হবে।

১৯ (৪) ধারায় উল্লেখ রয়েছে, অন্য কোনো আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন, শিশু আদালতে বিচার চলাকালীন, আইনজীবী, পুলিশ বা আদালতের কোনো কর্মচারী আদালতকক্ষে তাদের পেশাগত বা দাপ্তরিক ইউনিফর্ম পরিধান করতে পারবেন না।