মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী :

পাহাড় কাটার মামলায় কক্সবাজারে এক মহিলা সহ তিন পাহাড়খেকোকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। তারমধ্যে, একটি মামলায় ২ আসামীকে এক বছর ৬ মাস করে কারাদন্ড এবং এক লক্ষ টাকা করে অর্থদন্ড, অর্থদন্ড অনাদায়ে আরো ২ মাসের করে বিনাশ্রম কারাদন্ড প্রদান করা হয়েছে। ভিন্ন আরেকটি মামলায় একজন মহিলাকে ২ বছর কারাদন্ড অথবা দুই লক্ষ টাকা অর্থদন্ড, অর্থদন্ড অনাদায়ে আরো ৪ মাস বিনাশ্রম কারাদন্ড প্রদান করা হয়েছে।

কক্সবাজারের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত নম্বর-২ এর বিজ্ঞ বিচারক মোহাম্মদ এহসানুল ইসলাম যথাক্রমে গত ২৯ নভেম্বর এবং ৩০ নভেম্বর মামলা ২টির রায় ঘোষণা করেন। একই আদালতের বেঞ্চ সহকারী মেজবাহ উদ্দিন এ তথ্য জানিয়েছেন।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালে ৯ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার শহরের ঘোনারপাড়ায় পাহাড় কাটার ফলে পার্শ্ববর্তী নৌবাহিনীর নিজস্ব স্থাপনার সীমানা দেয়াল ধ্বসে পড়ে।

এ ঘটনায় কক্সবাজার পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ঘোনারপাড়ার বাসিন্দা মোক্তার আহমদের পুত্র ওমর ফারুক (৪২), নুরুল হোসেনের পুত্র আবদু শুক্কুর (৪১), মোস্তাক আহমদের পুত্র মোঃ ফারুক (৩১), আমিরুজ্জামানের পুত্র মোস্তাক আহমদ (৬০), মোঃ রফিকের পুত্র মোঃ জাফর (৩৮) ও তার ভাই মোঃ আলম ও কবির হোসেন (৩১) ৬ জনকে আসামী করে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। যার জিআর মামলা নম্বর : ৫৮৮/২০১৮ ইংরেজি (কক্সবাজার সদর)।

মামলাটি তদন্ত করে কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের তৎকালীন সহকারী পরিচালক সংযুক্তা দাশ গুপ্তা ৫ জন আসামীর বিরুদ্ধে ২০২১ সালে ২৫ মে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন। আসামী মোঃ আলম মৃত্যুবরন করায় তাকে মামলার দায় হতে বাদ দিতে প্রতিবেদনে আবেদন জানানো হয়।

মামলাটির চার্জ গঠন করে সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ, সাক্ষীদের আসামীদের পক্ষে জেরা, জব্দকৃত আলামত পর্যালোচনা, আসামীদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, যুক্তিতর্ক সহ মামলার সকল বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন করে বিজ্ঞ বিচারক সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলাম ১৯৯৫ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে দোষী সাব্যস্থ আসামী মোঃ ফারুক ও আবদু শুক্কুর কে এক বছর ৬ মাস করে কারাদন্ড এবং এক লক্ষ টাকা করে অর্থদন্ড, অর্থদন্ড অনাদায়ে আরো ২ মাস করে বিনাশ্রম কারাদন্ড প্রদান করা হয়েছে। দন্ডিত আসামীদ্বয় রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন। বিজ্ঞ বিচারক রায়ে মামলার অন্যান্য আসামীদের বেকসুর খালাস প্রদান করেন।

অন্যদিকে, ২০২১ সালের ২ মে কক্সবাজার পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ ঘোনার পাড়ায় পাহাড় কেটে এবং পানির কুয়া ভরাট করে বাড়ি নির্মাণ করায় একই এলাকার মাহমুদুল করিমের স্ত্রী জেসমিন আক্তার বেবি’র বিরুদ্ধে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। যার কক্সবাজার থানা মামলা নম্বর ০৫, তারিখ : ০২/০৫/২০২১ ইংরেজি, জিআর মামলা নম্বর : ২৮৮/২০২১ ইংরেজি (কক্সবাজার সদর)।

মামলাটি তদন্ত করে কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের তৎকালীন সহকারী পরিচালক সংযুক্তা দাশ আসামী জেসমিন আক্তার বেবি’র বিরুদ্ধে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন। মামলাটির চার্জ গঠন করে সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ, সাক্ষীদের আসামীর পক্ষে জেরা, আলামত পর্যালোচনা, আসামীকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, যুক্তিতর্ক সহ মামলার সকল বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন করে বিজ্ঞ বিচারক সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলাম ১৯৯৫ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ১৫(১) সারণির ৫ ধারায় দোষী সাব্যস্থ আসামী জেসমিন আক্তার বেবিকে দুই বছর সশ্রম কারাদন্ড অথবা দুই লক্ষ টাকা অর্থদন্ড, অর্থদন্ড অনাদায়ে আরো ৪ মাস বিনাশ্রম কারাদন্ড প্রদান করেন।

বেঞ্চ সহকারী মেজবাহ উদ্দিন জানান, দন্ডিত আসামী জেসমিন আক্তার বেবি ২ লক্ষ টাকা অর্থদন্ড রায় ঘোষণার দিনই সরকারি কোষাগারে জমা করেন। ফলে রায়ের নির্দেশনা মতে, তিনি অন্যান্য দন্ড থেকে অব্যাহতি পান।

রায় ঘোষণার পর মামলা ২টি দায়েরকালীন পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের তৎকালীন পরিচালক, বর্তমানে প্রবাসী কল্যান ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ উপসচিব মফিদুল আলম তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, কক্সবাজার পরিবেশ ও প্রতিবেশ সংকটাপন্ন সংবেদনশীল একটি এলাকা। এখানকার পরিবেশ ধ্বংসকারীদের নিয়মিত আইনের আওতায় এনে আইনানুগ শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হলে অপরাধীরা তাদের অপরাধকর্ম থেকে কিছুটা হলেও বিরত থাকবে। উপসচিব মুফিদুল আলম আরো বলেন, পরিবেশ সুরক্ষায় সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি সর্বস্থরের নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। কারণ সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া পরিবেশ পুরোপুরি রক্ষা করা কখনো সম্ভব নয়। রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এ রায় সমাজে ইতিবাচক ও গঠনমূলক একটা বার্তা দেবে।

রায় প্রসঙ্গে কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ তারেক বলেন, পরিবেশ ধ্বংসকারীদের অপতৎপরতায় কক্সবাজার দিন দিন বসবাস অযোগ্য হয়ে উঠছে। পরিবেশ ধ্বংসকারীদের তান্ডবে বিষিয়ে উঠছে সার্বিক পরিবেশ। তাই কক্সবাজারের পরিবেশ বাঁচাতে প্রত্যেককে যাঁর যাঁর অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে। ঘোষিত রায়ে পাহাড় খেকোরা আতংকিত হবেন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলা শাখার সভাপতি (ভারপ্রাপ্ত) এইচ.এম এরশাদ বলেন, আইনের যথাযথ প্রয়োগ হলে কক্সবাজারের সার্বিক পরিবেশ অনেক সুরক্ষা হবে। জীবনমান অনেক উন্নত হবে। তারমতে, বিচার বিভাগের পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা গুলোকে পরিবেশ রক্ষায় আরো দায়িত্বশীল হতে হবে। যাতে পরিবেশ ধ্বংসকারীরা সহজেই আইনের আওতায় আসে। বাপা সভাপতি এইচ.এম এরশাদ আরো বলেন, বিচার বিভাগ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের অন্যতম আশ্রয়স্থল। ঘোষিত রায় কক্সবাজারের পরিবেশ বাঁচাতে অনেক অবদান রাখবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।