মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী :

কক্সবাজারের চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (সিজেএম) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেছেন, কক্সবাজারের জন্য রোহিঙ্গারা একটি প্রকট সমস্যা। রোহিঙ্গারা স্থানীয় নাগরিকদের জন্য একটা বড় বোঝা। একইভাবে জেলা বিচার বিভাগও এ সমস্যার উর্ধ্বে নয়। স্থানীয় লোকজনের চেয়ে কয়েকগুণ বেশী অপরাধে জড়াচ্ছে রোহিঙ্গারা। খুন খারাবি সহ অধিকাংশ জগন্য অপরাধে রোহিঙ্গারা জড়িত। জেলা পুলিশ বিভাগ ও জেলা জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসীর পরিসংখ্যানে এ উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।

আর রোহিঙ্গাদের অপরাধের বিচার করাও এখন স্পর্শকাতর এবং ঝুঁকিপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিচারক ও আইনজীবীরাও এক্ষেত্রে ঝুঁকিমুক্ত নন। শংকা ও হুমকির মধ্যে রয়েছেন। কারণ রোহিঙ্গা অপরাধীদের সাথে অনেকক্ষেত্রে মিয়ানমারের সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আরসা ও আরএসও এর সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। তাই রোহিঙ্গা অপরাধী সম্পৃক্ত মামলায় যুক্ত হয়ে আইনী সেবা দিতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের জন্য তিনি আইনজীবী সহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহবান জানিয়েছেন।

গত বৃহস্পতিবার (৩১ আগস্ট) কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির উদ্যোগে আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে আয়োজিত নবাগত জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ শাহীন ইমরান সহ অন্যান্য বিচারকদের “বরণ অনুষ্ঠান” এ সিজেএম আবদুল্লাহ আল মামুন এ আহবান জানান।

বিজ্ঞ আইনজীবীদের উদ্দেশ্যে তিনি আরো বলেন, নিজে এবং পরিবার পরিজনকে ঝুঁকিুমুক্ত ও নিরাপদ রেখেই অর্থ উপার্জন করা উচিত।

সিজেএম আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, সরকারের উদ্যোগ থাকা সত্বেও দীর্ঘদিন ধরে জমির অভাবে কক্সবাজারে নতুন সিজেএম ভবন নির্মাণ করা যাচ্ছেনা। এজন্য বাধ্য হয়ে জেলা প্রশাসকের নীচ তলায় জরাজীর্ণ, অপরিসর, পর্যাপ্ত আলোবিহীন, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত পরিচালনা করতে হচ্ছে। এতে আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী সহ সংশ্লিষ্ট সকলকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

সিজেএম আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, কক্সবাজার শহরের চমৎকার লোকেশানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অভিজাত এলাকা হিলডাউন সার্কিট হাউসের পাশে নতুন সিজেএম ভবন নির্মাণের জন্য সরকার এক একর ৭৩ শতক জমি বরাদ্দ দিয়েছে। এ জমির দলিল করা, জমি বুঝে নেওয়া ইত্যাদি কাজ সম্পন্ন করা রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসাবে তাঁর দায়িত্ব। তিনি বলেন, সিজেএম ভবনের টাইপ প্ল্যান-ডিজাইন (প্রাক তৈরি নকসা) গুলো ১২ তলা বিশিষ্ট। কক্সবাজারে বরাদ্দ দেওয়া জমিতে ১২ তলার স্থলে ১৪ তলা বিশিষ্ট নান্দনিক স্থাপত্য শৈলীসম্পন্ন একটি আধুনিক সুবিধা সম্বলিত চীফ জুডিসিয়াল আদালত ভবন নির্মাণে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী এবং আইন ও বিচার বিভাগের সচিবকে তিনি অনুরোধ করেছেন বলে তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, নিজের দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি এ অনুরোধ করেছেন।

আগামী একশত বছর বা তারও অধিক সময় চিন্তা করে সরকার এসব গুরুত্বপূর্ণ ভবন নির্মাণ করে থাকেন। যদি প্রস্তাবিত এ ভবনটি নির্মিত হয়, তাহলে সেটি হবে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ সিজেএম ভবন। কক্সবাজার জেলা সদরে বর্তমান বিচারিক কাঠামোতে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এর ৮ টি এজলাস প্রয়োজন হলেও প্রস্তাবিত নতুন সিজেএম ভবনের ডিজাইন-প্ল্যানে উন্নত সুযোগ সুবিধা সম্বলিত ২০টি সুপরিসর এজলাস রয়েছে।

তিনি বলেন, শুধুমাত্র কক্সবাজার জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসীতে ৪৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার মামলা রয়েছে। কক্সবাজারের বিচারকেরা অতিরিক্ত মামলার চাপে অনেকটা ভারাক্রান্ত। এজন্য অপেক্ষাকৃত দ্রুততম সময়ে প্রস্তাবিত সিজেএম ভবন নির্মাণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

প্রস্তাবিত নতুন সিজেএম ভবনের বিষয়ে আইনজীবীদের কোন বক্তব্য থাকলে তা আইনজীবী সমিতির কার্যকরী কমিটি, সিনিয়র আইনজীবী বা রাজনৈতিক দায়িত্বশীলদের মাধ্যমে আইন মন্ত্রী ও সচিবের নজরে আনার জন্য সিজেএম আবদুল্লাহ আল মামুন আইনজীবীদের প্রতি অনুরোধ জানান।

সিজেএম আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, বিচারকদের বেশী প্রশংসা ও অযথা সমালোচনা করা কোনোভাবেই উচিত নয়। বেশি প্রশংসা করলে তার প্রতি দুর্বলতা জম্মে, অহেতুক ও মিথ্যা সমালোচনা করলে তার প্রতি বিরাগ জম্মায়। তাই কাজের স্বীকৃতির জন্য ন্যূনতম যেটুকু মূল্যায়ন দরকার, বিচারকদের শুধুমাত্র সেটুকু প্রশংসা করা উচিত।

সিজেএম বলেন, জেলা বিচার বিভাগের কর্ণধার নবাগত জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ শাহীন উদ্দিন একজন সৎ, দক্ষ, অভিজ্ঞ, দূরদর্শী ও মেধাবী বিচারক। তাঁর নেতৃত্বে কক্সবাজার জেলায় বিচারপ্রার্থী বান্ধব সেবাধর্মী একটি সমৃদ্ধ, সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন বিচার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সিজেএম আবদুল্লাহ আল মামুন দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম এর সভাপতিত্বে, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ তারেক এর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত উক্ত বরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে বক্তব্য রাখেন-কক্সবাজারের নবাগত জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ শাহীন উদ্দিন।

অ্যাডভোকেট নেজামুল হকের কোরআন তেলাওয়াত এর মাধ্যমে শুরু হওয়া বরণ অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১, ২ ও ৩ এর বিচারক (জেলা জজ) যথাক্রমে মোহাম্মদ মোসলেহ উদ্দিন, মোহাম্মদ নুরে আলম ও মোহাম্মদ আবু হান্নান, কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতের বিচারক মোহাম্মদ সাইফুল এলাহী, কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট শাহজালাল চৌধুরী, সাবেক সভাপতি ও জিপি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ ইসহাক, সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম ছিদ্দিকী, সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম, সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট মো: ছৈয়দ আলম, সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আব্বাস উদ্দিন চৌধুরী, পিপি অ্যাডভোকেট ফরিদুল আলম ফরিদ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোস্তাক আহমদ চৌধুরী, অ্যাডভোকেট শিবু লাল দে, অ্যাডভোকেট বাবলু মিয়া বক্তব্য রাখেন।

বরণ অনুষ্ঠানে অন্যান্য বিচারকদের মধ্যে, কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম আদালতের বিচারক যথাক্রমে মোঃ আবদুল কাদের, মো: মোশারফ হোসেন ও নিশাত সুলতানা, যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ প্রথম ও দ্বিতীয় আদালতের বিচারক যথাক্রমে মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম ও মোছা: রেশমা খাতুন, সিনিয়র সহকারী জজ সুশান্ত প্রাসাদ চাকমা, সিনিয়র সহকারী জজ মৈত্রী ভট্টাচার্য, সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শ্রীজ্ঞান তঞ্চঙ্গা, সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আখতার জাবেদ, সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আসাদ উদ্দিন মোঃ আসিফ, জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার ও সিনিয়র সহকারী জজ সাজ্জাতুন নেছা লিপি, সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলাম, সিনিয়র সহকারী জজ ওমর ফারুক, সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফাহমিদা সাত্তার প্রমুখ।

অনুষ্ঠানের শুরুতে নবাগত জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ শাহীন উদ্দিন সহ উপস্থিত সকল বিচারকদের কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির নেতৃবৃন্দ ফুল দিয়ে বরণ করে নেন।

প্রসঙ্গত, বরণ অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি, কক্সবাজারের নবাগত জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ শাহীন উদ্দিন গত ৩০ আগস্ট যোগদান করেন। কক্সবাজারের ভারপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ এর দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতের বিচারক মোহাম্মদ সাইফুল ইলাহী থেকে তিনি জেলা ও দায়রা জজ এর দায়িত্ব বুঝে নেন।

বিচারক মোহাম্মদ শাহীন উদ্দিন হলেন-কক্সবাজারের ১৭তম জেলা ও দায়রা জজ। তিনি ১৮তম বিসিএস (জুডিসিয়াল) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৯৯ সালের জানুয়ারি মাসে নবীন বিচারক হিসাবে ‘সহকারী জজ’ পদে সরকারি চাকুরীতে যোগ দেন।

বিচারক মোহাম্মদ শাহীন উদ্দিন এর আগে খাগড়াছড়ি’র জেলা ও দায়রা জজ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার আগে তিনি কক্সবাজার জেলা জজশীপে যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ পদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

এছাড়া, বিচারক মোহাম্মদ শাহীন উদ্দিন নরসিংদীর অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ, বরিশালের চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম), নারায়ণগঞ্জে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা জজ) সহ দেশের বিভিন্ন বিচারালয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।

বিচারক মোহাম্মদ শাহীন উদ্দিন চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলার জঙ্গলখাইন ইউনিয়নের নাইখাইন গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর পিতা মরহুম মোহাম্মদ আবদুল্লাহ ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ট্যাক্সেস অফিসার এবং একজন সফল অভিবাবক। মাতা ছেমন আরা বেগম একজন রত্নগর্ভা। মরহুম মোহাম্মদ আবদুল্লাহ ও ছেমন আরা বেগম দম্পতির ৮ পুত্র এবং ৩ কন্যার মধ্যে বিচারক মোহাম্মদ শাহীন উদ্দিন তৃতীয়। এ সফল দম্পতির সন্তানেরা সকলেই স্ব স্ব ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত।