মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী :

লিগ্যাল এইড সংবিধানের আলোকে দেশের সকল নাগরিক সমতার ভিত্তিতে ন্যায় বিচার পাওয়ার জন্য সরকারের এক অনবদ্য সৃষ্টি। মিথ্যা মামলা দায়ের করে কাউকে হয়রানি করার জন্য লিগ্যাল এইড নয়। মিথ্যা মামলা সুশাসনের পরিপন্থী, ন্যায় বিচারের অন্তরায়।

বুধবার ২৮ এপ্রিল জাতীয় আইনগত সহয়তা দিবস-২০২২ (লিগ্যাল এইড দিবস) উপলক্ষে কক্সবাজার জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির চেয়ারম্যান ও কক্সবাজারের সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল দিবসের এক আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে একথা বলেন।

জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার ও সিনিয়র সহকারী জজ সাজ্জাতুন নেছা লিপি’র সঞ্চালনায় কক্সবাজার জেলা জজ আদালত ভবনের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় অন্যান্যের মধ্যে সংসদ সদস্য কানিজ ফাতেমা আহমেদ, চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আলমগীর মোহাম্মদ ফারুকী, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক এডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা, কক্সবাজার জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শ্রাবস্তী রায়, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ আবু সুফিয়ান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এডভোকেট ইকবালুর রশিদ আমিন সোহেল, UNHCR এর কর্মকর্তা ইলিয়াস নাগোগি, লিগ্যাল এইড কমিটির প্যানেল আইনজীবী এডভোকেট মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী বক্তব্য রাখেন।

লিগ্যাল এইড কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইসমাইল আরো বলেন, মেজর (অব:) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ হত্যাকান্ডের বিচারের পর কক্সবাজারে বিচার বহির্ভুত হত্যাকান্ড প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। আগে প্রতিটি বিচার বহির্ভুত হত্যাকান্ড নিয়ে মাদক, অস্ত্র ও হত্যার ৩ টি পৃথক ফৌজদারী মামলা হতো। এসব কারণে কক্সবাজার বিচার বিভাগ মামলার ভারে জর্জরিত। অতি উৎসাহী হয়ে এইরূপ মামলা বৃদ্ধি করে বিচারক ও বিচার বিভাগকে ব্যস্ত করে রাখা হয়েছে। যা বিচার বিভাগের জন্য মোটেও সুখকর নয়। এজন্য বিচারপ্রক্রিয়া বিলম্বিত ও ব্যাহত হয়।

তিনি বলেন-কক্সবাজারের জন্য আরো নতুন করে ৪ জন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ এবং চকরিয়ার জন্য ১ জন যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ এর পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। আগামী এক মাসের মধ্যে নতুন সৃজিত ৫ জন বিচারককে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। নতুন সৃজিত এসব আদালতের কার্যক্রম শুরু হলে কক্সবাজার বিচার বিভাগে মামলার জট কিছুটা হলেও কমে আসবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

কক্সবাজারের সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রীর স্বদিচ্ছায় কক্সবাজারকে ইতিমধ্যে আধুনিক, উন্নত ও মডেল জেলা হিসাবে গড়ে তোলার জন্য এখানে উন্নয়নমূলক বিভিন্ন মেগা প্রজেক্টের কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। যার ফলে কক্সবাজারে জায়গা জমির দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। জমি-জমার বিরোধের কারণে মামলা মোকদ্দমার সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে।

সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল প্রকৃত অপরাধীদের মামলায় অন্তর্ভুক্ত করে, মামলায় অহেতুক আসামীর সংখ্যা না বাড়িয়ে, নির্দোষ ও নিরীহদের মামলায় না জড়িয়ে, মামলার বিচার কার্যক্রম সুষ্ঠু ও দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তিতে সংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেন। অতি উৎসাহী না হয়ে, আইনানুগ ও পেশাদারিত্ব দিয়ে প্রত্যেককে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহবান জানান।

“বিনা খরচে আইনি সহায়তা, শেখ হাসিনা সরকার দিচ্ছে এই নিশ্চয়তা” এই প্রতিপাদ্য নিয়ে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় লিগ্যাল এইড এর উপকারভোগী তসলিমা আক্তার ও মোহাম্মদ মিলন তাদের অনুভূতি প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন। সভায় জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের প্রধান সহকারী হাসান ইমতিয়াজ এর ব্যবস্থাপনায় লিগ্যাল এইড বিষয়ক একটি ভিডিও ডকুমেন্টারি প্রদর্শন করা হয়। সভার শুরুতে কোরআন তেলাওয়াত করেন-মহেশখালীর সহকারী জজ আবদুল মান্নান, ত্রিপিটক পাঠ করেন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শ্রীজ্ঞান তঞ্চঙ্গাঁ এবং গীতা পাঠ করেন এডভোকেট প্রতিভা দাশ।

সভায় প্যানেল আইনজীবী এডভোকেট মোহাম্মদ আবদুর রশিদ ও এডভোকেট ইয়াসমিন শওকত জাহান রোজীকে বর্ষসেরা প্যানেল আইনজীবীর ক্রেস্ট প্রদান করেন সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল। কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের ২ জন ইন্টার্নি শিক্ষার্থী যথাক্রমে সোনিয়া জেসমিন মৌমিতা ও নেজাম উদ্দিনকে অনুষ্ঠানে ইন্টার্নিশীপের সনদ ও ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।

দিবসটি পালন উপলক্ষে কক্সবাজার জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত দিনব্যাপী কর্মসূচীর মধ্যে বৃহস্পতিবার সকাল ৯ টায় জেলা জজ আদালত চত্বরে বর্নাঢ্য র‍্যালী’র উদ্বোধন করেন কমিটির চেয়ারম্যান ও সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল। এরপর র‍্যালীটি কক্সবাজার শহরের গুরত্বপূর্ণ সড়ক সমুহ প্রদক্ষিণ করে।

র‍্যালী ও আলোচনা সভায় বিজ্ঞ বিচারকদের মধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক মোহাম্মদ মোসলেহ্ উদ্দিন, ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক মোঃ মশিউর রহমান খান, ট্রাইব্যুনাল-৩ এর বিচারক মোহাম্মদ আবদুর রহিম, অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আবদুল্লাহ আল মামুন, অতিরিক্ত চীফ জুডিসিয়াল রাজীব কুমার বিশ্বাস, যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ-১ মাহমুদুল হাসান, যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ-২ মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, সিনিয়র জুডিশিয়াল মাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আবুল মনসুর ছিদ্দিকী, সদরের সিনিয়র সহকারী জজ সুশান্ত প্রসাদ চাকমা, জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হামীমুন তানজীন, জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আখতার জাবেদ, জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আসাদ উদ্দিন মো: আসিফ, জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলাম, টেকনাফের সহকারী জজ মো: ওমর ফারুক, রামু’র সহকারী জজ মো: মাজেদ হোসাইন সহ জেলা জজশীপ ও ম্যাজিস্ট্রেসীতে কর্মরত বিচারকবৃন্দ, বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

এছাড়া, জিপি এডভোকেট মোহাম্মদ ইসহাক, পিপি এডভোকেট ফরিদুল আলম, কক্সবাজার প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মুজিবুল ইসলাম, জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট মোহাম্মদ তাওহীদুল আনোয়ার, স্পেশাল পিপি বৃন্দ, বিভিন্ন পর্যায়ের আইন কর্মকর্তাগণ, প্যানেল আইনজীবীগণ, সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উর্ধতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে, জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করতে আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ, কক্সবাজার বিচার বিভাগের বিজ্ঞ বিচারকবৃন্দ, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, বিশিষ্টজন, সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের উর্ধতন কর্মকর্তাগণ, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি সহ সংশ্লিষ্ট সকলে বিভিন্ন কর্মসূচীতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ায় সকলকে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার ও সিনিয়র সহকারী জজ সাজ্জাতুন নেছা লিপি জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির পক্ষে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। সরকারের জনকল্যাণমুলক এই লিগ্যাল এইড কার্যক্রম আরো গতিশীল, সফল ও প্রসার ঘটাতে ভবিষ্যতে তিনি সংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেছেন।